ঢাকা সোমবার, অক্টোবর ১৪, ২০১৯

অনুপ্রেরণায় ক্রিশ্চিয়ানোঃ আরফিন শিশির

Spread the love

মাধ্যমিকের অংক খাতায় যে ছেলেটা শূন্য পেয়ে জীবনের শেষ দেখে ফেলেছে। তাকে তুমি একটা অনুপ্রেরণার গল্প শুনিয়ে দাও। তাকে বলে দাও, ২০০৪ সালে তার সমবয়সী এক কিশোর পর্তুগালের লিসবন শহরে আকাশ ছুঁতে গিয়েও একদম কাছ থেকে ছুঁতে পারেনি। খালি হাতে ফিরে অংকে ফেইল করা ছেলেটার মত ঠোঁটকামড়িয়ে বালিশ ভিজিয়ে কেঁদেছে।

প্রতিপক্ষ সেদিন খিল্লি করেছে। শিরোপা জয়ীদের ফ্রন্ট পেইজের ব্যাকগ্রাউন্ডে চাপা পড়ে গেছে ১৯ বছরের এক পরাজিত কিশোরের জলছবি। তবে সেরা হওয়ার রেসে তাকে কেউ আটকাতে পারেনি। ১২ বছর পর ২০১৬’তে এসে সেই মানুষটা ঠিকই আকাশ ছুঁয়েছেন।

প্রমাণ দিয়ে গেছেন, ইন্সুরেন্সে চাকরী করা বদমেজাজি বাবার শাসন কিংবা বাঁশের কঞ্চি হাতে শাসানো মায়ের ভয় কোনটাই তোমার সম্ভাবনাকে গিলে খেতে পারবে না।

তুমি অপেক্ষা করো। জেদ, পরিশ্রম আর অনবদ্য জয়ের ক্ষুধা তোমার নট পসিবলকে একদিন “হোয়াই নট পসিবলে রূপ দেবেই। পেটপুরে খেতে না পারা যে ছেলেটার কাছে জন্ম নেওয়ার কোন স্বার্থকতা নেই। তাকে তুমি একটা শ্যামসুন্দর কাহিনী বলে দাও।

তাকে জানিয়ে দাও, নুন কিনতে পান্তা ফুরনো এক মহিলা জন্মের আগেই মেরে ফেলতে চেয়েছিল তার পেটের সাত মাসের বাচ্চাটাকে। গলা টিপে মারতে চেয়েছিল ভাত তুলে দিতে না পারার মানসিক যন্ত্রণায়।

দারিদ্রতা তাকে বিদ্রূপ করেছে। ৫ ডলারের একটা ফুটবল কিনতে না পারায় মায়ের আঁচলে সেদিন কান্না লুকিয়েছে ছেলেটি। কিন্তু দারিদ্রসীমা তাকে ম্যানচেস্টার, মাদ্রিদ আর তুরিনের মত রাজসিক শহরে রাজত্ব করা থেকে আটকাতে পারেনি।

হাত কব্জিতেও নয়, মানুষটা শানশৌকতে ভরা পুরো ইউরোপে রাজত্ব করেছেন স্রেফ পায়ের গোড়ালির মোহময় মোচড়ে। জানিয়ে দিয়ে গেছেন, জয়ী হবার অদম্য মানসিকতা রাখলে, “তোমাকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না” বলা মানুষগুলোই একদিন “তোমাকে দিয়ে হবেনা এমন কিচ্ছু নেই” বলে হাততালি দেবে।

১৬ ঘন্টা পড়েও ডিপার্টমেন্ট টপার হতে না পারা মেয়েটা নিজেকে লুজার ভাবে। পিছিয়ে পড়ার হতাশাগুলো চুপিসারে লিখে রাখে ডায়েরীর কোণায়।

তাকে বলে দিও, বিংশ শতাব্দীর কম্পিটিটিভ ফুটবলে একপিচ ব্যালন ডি অর পেতে যেখানে নাভিশ্বাস উঠে যায়। সেখানে ৪-১ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়েও একটা মানুষ হার মানেনি। ইতিহাসের বোকা বইয়ে লেখা ডেফিনিশনের ভুল ভাঙ্গিয়ে সংখ্যাটা নিয়ে গেছেন ফাইভ ইকোয়েল ফাইভে।

মানুষটা বারে বারে শিখিয়ে গেছে, এচিভমেন্টের মার্কশীটটা নাগরদোলার মাটি নয় যে পালাক্রমে হাতে আসে। দুই হাজার প্রতিযোগীকে ঠেলে ফেলার পরও তোমার যুদ্ধ শেষ হবে না।
কারণ, তোমার যুদ্ধ নিজেকে ছাড়িয়ে যাবার।

কিসের অসম্ভব ব্রাদার? অসম্ভব কেবল ভীতুদের জন্যে হয়। বিজেতার চোখে সবকিছু সমতল। ভীনগ্রহের লিও মেসির মত তিনি অতোটা ঈশ্বর প্রদত্ত ট্যালেন্ট নিয়ে জন্মাননি ঠিকি,
কিন্তু পরিশ্রমকে পুঁজি করে মারিয়ানার ট্রেঞ্চ থেকে সফলতাকে ছিনিয়ে এনেছেন ছোঁ মেরে। হাপিঁয়ে উঠা পেশিগুলোকে ধমক দিয়ে ছুটেছেন ঘন্টার পর ঘন্টা। মাইলের পর মাইল।

ট্রফিজয়ী কোন তারকার আঙ্গুল ধরে দুবেলা ফুটবল চর্চার ভাগ্য তার কপালে ছিলনা। তাই পায়ের তলার ঝুরঝুরে মাটিগুলোকে ট্রাক এন্ড ফিল্ডের ম্যারাথন বানিয়ে নিয়েছেন।
পিঠ ঠেকে যাওয়া দেওয়ালটাকে বানিয়ে নিয়েছেন বিজয়ীর ক্যারিব্যাগ।

মরচে ধরা একটা দলকে এক সুতোয় গেঁথে তৃতীয় সারির পর্তুগালকে নিয়ে এসেছেন ইউরোপ মুকুটের দাবিদারের তালিকায়। তিনি হয়তো ডেল কার্নেগীর মত মোটিভেশনাল কিংবা এলিগ্যান্ট কোন অনুপ্রেরণামূলক বই লিখতে পারেননি। কিন্তু বয়সের কাছে হার মেনে যাওয়া লাখো থার্টি প্লাস মধ্যবয়সীর ইনস্পারেশন তিনি।

তার গন্ডি হয়তো গোলগাল গ্যালারীর দেয়াল আর একটা ৯০ মিনিটের ফুটবল মাঠে সীমাবদ্ধ। কিন্তু একশন সিরিজের মডেলীয় দেহটায় ট্যাটু না লাগিয়ে তিনি দেখিয়ে গেছেন, সৌন্দর্য রঙচঙা দেহের আঁকা ট্যাটুতে নয়। ক্যালেন্ডারের ৯০ দিন পেরিয়ে থেলাসেমিয়ায় ভোগা এক বাচ্চার রক্তদাতা হওয়াটাও একটা সৌন্দর্য। একটা এভসুলুট বিউটি।

তোমার গায়ে লেভিসের জামা নেই। পকেটভর্তি টাকা নেই। জন্মাওনি ২০ বাই ২২ রুমের দামী বিছানায়। তুমি হতাশ হয়ে ভেঙ্গে পড়? এশট্রের ফুটোটায় সিগারেট ফুঁকে ছাইপাঁশ ফেলো?

তোমার মনে হয়, জীবনটা বোধয় শেষ হয়ে গেছে এখানেই। ঠিক এমন সময় একাকী বসে এই মানুষটার গল্প পড়ো। তার হার না মানা মানসিকতার কাহিনীগুলো উল্টেপাল্টে দেখো।
১৯৮৫ থেকে ২০১৯। শূন্য থেকে মহাশূন্যে পৌঁছে যাওয়া এই মানুষটাই তোমাকে এগিয়ে যাবার গান শোনাবে। শেখাবে গলিবয় থেকে ক্যাপিটালের গলিসম্রাট হবার মূলমন্ত্র।

শৈশব থেকে কৈশোর। কৈশোর পেরিয়ে যৌবন। চব্বিশ পেরিয়ে আরো কুড়ি বছর। যখনি হেরে গিয়ে পা দুটো থেমে যেতে চায়। তখনি এই মানুষটার জীবনগল্প আমাকে শক্তি যোগায়, সাহস বাড়ায়।

তাই আমার কোন মোটিভেশনাল স্পিচের দরকার নেই। কারন, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর এক একটা গোল আমার জন্য এক একটা জীবন্ত মোটিভেশন।