যে দুর্ণীতি না হলে ব্রাজিলের বিশ্বকাপ থাকতে পারত সাতটি

বলা হয় ফুটবলের আবিষ্কার করেছে ইংল্যান্ড, আর এটাকে পূর্ণতা দিয়েছে ব্রাজিল। ফুটবল ইতিহাসে সবচেয়ে সফল দল বলা হয় ব্রাজিলকে। ল্যাতিনের এই দলটি ৫বার বিশ্বকাপ জিতেছে যা যেকোন দলের তুলনায় সর্বোচ্চ।

তবে ব্রাজিলের বিশ্বকাপ ৫টি হলেও তাদের বিশ্বকাপ থাকতে পারত সাতটি। দুটি বিশ্বকাপের আসরে তাদের বিদায় ঘটেছে দূর্ণীতির কারণে। বলা ভালো দূর্ণীতি করে তাদের বিশ্বকাপ থেকে বাদ দেয়া হয়েছে।

তারমধ্যে একটি আসর হচ্ছে ১৯৬৬ বিশ্বকাপ যেখানে ইংল্যান্ড চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। এই আসরের আগের দুটি আসরে পরপর চ্যাম্পিয়ন ছিল ব্রাজিল। টানা তিনটি বিশ্বকাপ জয়ের জন্যই আসরে পা রেখেছিল ব্রাজিল।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে তখন কুড়ি বছর মোটে পেরিয়েছে এবং ইউরোপের মাটিতে বিভাজনের রাজনীতির ঘা তখনও দগদগে। সেই সময়ে দুশমন জার্মান বা ইতালিয়ানদের মতো একবারও বিশ্বকাপ না জিততে পারাটা ইংল্যান্ডের কাছে যথেষ্ট অস্বস্তির কারণ ছিল। আর তাই তারা ঝাঁপায় অন্তত একটিবার শিরোপা জয়ের লক্ষ্যে।

১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপটি ফিফা বিশ্বকাপের ইতিহাসে অন্যতম বড় বিতর্কিত প্রতিযোগিতা। বিশ্বকাপের শুরুর আগে ইংল্যান্ডের বিখ্যাত খেলোয়াড় ববি মুর নাকি বলেছিলেন যে তুঙ্গে থাকা ব্রাজিল দল থেকে যদি পেলেকে সরিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তিনি বিশ্বকাপটি তাঁর দেশবাসীর জন্যে নিয়ে আসবেন।

ব্রাজিল তার আগে ১৯৫৮ এবং ১৯৬২-র বিশ্বকাপ জিতে জুলে রিমে কাপটি চিরকালের জন্যে দখল করার ইতিহাসের সামনে।

কিন্তু ব্রাজিলের বিরুদ্ধে যেন আঁতাঁত ঘোষণা করল দুনিয়ার অশুভশক্তি। ব্রাজিল সেবারে গ্রুপ পর্যায়েই ছিটকে যায়। গ্রুপের খেলায় পেলেকে এমন মারে বুলগেরিয়ার খেলোয়াড়রা যে তিনি হাঙ্গেরির সঙ্গে দ্বিতীয় ম্যাচে আর খেলতেই পারেননি। সেই ম্যাচে ব্রাজিলের দু’টি গোলও অবৈধ ঘোষণা করা হয়।

তৃতীয় ম্যাচেও পর্তুগালের খেলোয়াড় জোয়াও মোরেইস ফের পেলেকে আহত করে মাঠের বাইরে পাঠান। মোরেইসকে রেফারি এই কাণ্ডের জন্যে সাবধানও করেননি। এখানে বলা যেতে পারে যে ব্রাজিলের খেলাগুলিতে রেফারির ভূমিকায় ছিল পশ্চিম জার্মান এবং ইংল্যান্ডের আধিকারিকরা।

সেবারের বিশ্বকাপ থেকে দেশে ফিরে আয়োজক দেশের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগড়ে দেন পেলে। এমনকি ইংল্যান্ডের বিশ্বজয়ী দলের প্রকৃত ক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। ফাইনালে সেবার পশ্চিম জার্মানিকে ৪-২ গোলে হারিয়ে কাপ যেতে ইংল্যান্ড।

দ্বিতীয় ঘটনাটি ছিল ১৯৭৮ সালে। ১৯৭৮ বিশ্বকাপ হয়েছিল আর্জেন্টিনার মাটিতে। তখন কোন নকআউট পর্ব ছিল না। গ্রুপ পর্ব শেষে আটটি দল দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠত। তারপর সেখানে আবার চারটি করে দল ভাগ হয়ে লড়াই করত। দুই গ্রুপের সেরা দুই দল ফাইনাল খেলত। দুই গ্রুপের রানার্সআপ দুই দল তৃতীয় স্থান নির্ধারনী ম্যাচে অংশ নিত।

সেবার ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, পেরু ও পোল্যান্ড একই গ্রুপে পড়েছিল। প্রথম ম্যাচে ব্রাজিল পেরুকে ৩-০ গোলে এবং আর্জেন্টিনা পোল্যান্ডকে ২-০ গোলে হারায়। দ্বিতীয় ম্যাচে ব্রাজিল আর্জেন্টিনা ০-০ গোলে ড্র করে। তৃতীয় ম্যাচে ব্রাজিল পোল্যান্ডকে ৩-১ গোলে হারায়। ফলে ব্রাজিলের গোল ব্যবধান দাড়ায় ৫। আর্জেন্টিনার গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হতে হলে পেরুকে হারাতে হবে ৪-০ গোলে।

তবে আর্জেন্টিনা ম্যাচটি জিতে নেয় ৬-০ গোলে। আর্জেন্টিনা ও পেরুর এই ম্যাচটি ছিল ইতিহাসে সবচেয়ে কলঙ্কিত অধ্যায়গুলোর একটি। কথিত আছে পেরুর সাথে ম্যাচটি পাতানো ছিল আর্জেন্টিনার। এটা স্পর্ষ্ট বুঝা যায় ম্যাচে পেরুর খেলোয়াড়দের আচরণের মাধ্যমে। তাদের সামনে দিয়ে বল গেলেও বাধা দেয়ার কোন চেষ্টা নেই। গোলকিপার অন্তত চারটি গোল কোন কঠিন পরীক্ষা ছাড়াই বাঁচাতে পারতেন।

শুধু তাই নয়, আ্র্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা যখন বল নিয়ে প্রবেশ করত তখন অনেকটা নিয়ম করেই লোক দেখানো নাটকের মাধ্যমে তারাই গোলের পথ তৈরি করে দিয়েছিল।

পরবর্তিতে পেরুর এক সংসদ সদস্য স্বীকার করেন ম্যাচটি পাতানোর কথা। পেরুরু ১৩ জন নাগরিক ছিল আর্জেন্টিনার জেলে। তাদের মুক্তির বিনিময়ে পেরু ম্যাচটি হেরে যায়।

আর্জেন্টিনা দলের খেলোয়াড় লিওপোলদো পরবর্তিতে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, আমার নিজেকে এখন অপরাধী মনে হয়। এই বিশ্বকাপ জয়ে আমি স্বার্থকতার কিছু পাই না। আর্জেন্টিনার তৎকালীন দলটির কোচও স্বীকার করেছিলেন এই ম্যাচ পাতানোর কথা। তিনি বলেছিলেন, আমরা বুঝতে পেরেছিলাম এমন কিছু হচ্ছে। কিন্তু আমরা আমাদের মনোযোগ ম্যাচে রেখেছিলাম।

এই দুটি বিশ্বকাপে যদি কোন দূর্ণীতি না হত তাহলে হয়তো ব্রাজিলের বিশ্বকাপ জয়ের সংখ্যাটা ৫ না হয়ে সাত হতে পারত।

Related posts