আলোর পথে পা বাড়ালো রিয়াল: নওশাদ মুন্না

রাতের পরে যেমন দিন আসে, তেমনি দিনের পরে আসে রাত। রাত-দিন আসবেই। ইহা চিরন্তন সত্য। সত্য কখনো পরিবর্তিত হয় না। এটাই সত্যের সবচেয়ে বড় গুণ। রাত যতো বড়ই হোক না কেন, একসময় ভোরের আলো পুব আকাশে উঁকি মারবেই। তবে, রাত কখনো দীর্ঘস্থায়ী কখনোবা ক্ষণস্থায়ী হয়ে থাকে। রাতের পরিধি বাড়ুক অথবা কমুক, দিনের দেখা মিলবেই। অন্ধকারকে পাশ কাটিয়ে আলোর দেখা জগৎ পাবেই। সেই সাথে হবে নতুন স্বপ্নের শুরু। সকলে দিগন্তের পানে পা বাড়াবে। হবে আলোর পথযাত্রী।

আলো-অন্ধকার অথবা দিন-রাত, যেটাই বলি না কেনো, রিয়াল মাদ্রিদের সাথে তা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। কখনো রিয়াল মাদ্রিদ পেয়েছে আলোর দেখা, আবার কখনো পেয়েছে একরাশ অন্ধকার। অন্ধকারাচ্ছন্ন সেই রাতগুলো কখনো দীর্ঘসময় স্থায়ী হয়েছে, কখনো স্থায়ী হয়েছে স্বল্পসময়। তবে, বারবারই রিয়াল মাদ্রিদ পেয়েছে আলোর দেখা। অন্ধকারকে সরিয়েছে রাজার বেশে। আলো-অন্ধকারের এই খেলা বাস্তবিক জীবনে উত্থান-পতন হিসেবে পরিচিত। রিয়াল মাদ্রিদের সাথে এই উত্থান-পতনের ঘটনা ঘটেছে বহুবার। কখনো উত্থান, কখনো পতন, তারপর আবার উত্থান। তবে বারবারই বীরের বেশে উত্থিত হয়েছে রিয়াল মাদ্রিদ।

আজ আরো একবার আলোর দেখা পেলো রিয়াল মাদ্রিদ। জিতে নিলো ৩৪তম লা-লীগা ট্রফি। এ নিয়ে রিয়াল মাদ্রিদের মোট ট্রফি সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ালো ১১৯ টিতে। আলো-অন্ধকারের মধুর খেলার মধ্য দিয়েই রিয়াল মাদ্রিদ এই ট্রফিগুলো জিতেছে। কখনো ছিলো আলোময় সোনালী দিন। কখনো ছিলো অন্ধকারাচ্ছন্ন রাত। উত্থান-পতনের এই দিনগুলোর সাথে সবারই পরিচিত হওয়া দরকার।

১৯০২ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়া রিয়াল মাদ্রিদ ফুটবল ক্লাবের শুরুটা ছিলো মাঝামাঝি টাইপের। না আমাবস্যা না পুর্নিমা। দুটোর মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিলো সেই সময়টা। প্রতিষ্ঠালগ্ন হতে ১৯৩০ সাল পর্যন্ত রিয়াল মাদ্রিদ মোট ২২টি ট্রফি জিতে। যার মধ্যে স্প্যানিশ কাপ ৫টি এবং রিজিওনাল চ্যাম্পিয়ানশিপ ১৭টি।

তারপরের ২৪ বছর ছিলো আরো অন্ধকারাচ্ছন্ন। আরো একটি হতাশার সময়কাল। ১৯৩০-১৯৫৪ সাল পর্যন্ত রিয়াল মাদ্রিদ ৩টি লা-লীগা, ৪টি স্প্যানিশ কাপ, ১টি মিনি বিশ্বকাপ, ১টি রিজিওনাল চ্যাম্পিয়ানশিপ, ৫টি মেনকোমুডোস ট্রফিসহ মোট ১৪টি ট্রফি।

তারপরের বারো বছরকে রিয়াল মাদ্রিদের সোনালী সময় বলা যেতে পারে। স্টেফানো, গেন্তুদের হাত ধরে মাদ্রিদের ট্রফি কেবিনেটে প্রথমবারের মতো যোগ হয় চ্যাম্পিয়ন্স লীগ(তৎকালীন নাম ‘ইউরোপিয়ান কাপ’)। ১৯৫৫-১৯৬৬ সালের মধ্যকার সময়ে রিয়াল মাদ্রিদ মোট ১৯টি ট্রফি জেতে। যা রিয়াল মাদ্রিদের ট্রফি কেবিনেটকে সমৃদ্ধ করে। ১৯টি ট্রফির মধ্যে চ্যাম্পিয়ন্স লীগ ৬টি, ক্লাব বিশ্বকাপ ১টি, লা-লীগা ৮টি, স্প্যানিশ কাপ ১টি, মিনি বিশ্বকাপ ১টি এবং ল্যাটিন কাপ ২টি। রাজকীয় রিয়াল মাদ্রিদ তাদের দাপট এবং সামর্থ্য পুরো বিশ্বকে ভালো করেই দেখিয়েছিলো। এই সোনালী সময়ের পর যে আরো একবার অন্ধকারের রাত অপেক্ষা করছে, তা কে জানতো?

১৯৬৭-১৯৯৭ সাল। ৩০ বছর। এই ৩০ বছরে রিয়াল মাদ্রিদ সকল ট্রফির দেখা পেলেও, পায়নি চ্যাম্পিয়ন্স লীগের দেখা। সপ্তম চ্যাম্পিয়ন্স লীগের দেখা না পাওয়া রিয়াল মাদ্রিদ এই ৩০ বছরে মোট ৩১টি ট্রফি জয় করে। ২টি উয়েফা কাপ, ১৬টি লা-লীগা, ৭টি স্প্যানিশ কাপ, ৫টি স্প্যানিশ সুপার কাপসহ ৩১টি ট্রফি জয় করে রিয়াল মাদ্রিদ। তবুও চ্যাম্পিয়ন্স লীগের দেখা না পাওয়ায় এই সময়টা কাটে হতাশায়, না পাওয়ার আক্ষেপে।

৩২ বছরের চ্যাম্পিয়ন্স লীগের খরা কাটিয়ে ১৯৯৭-৯৮ সিজনে সপ্তম চ্যাম্পিয়ন্স লীগ জেতে রিয়াল মাদ্রিদ। সেই থাকে এক স্বপ্নীল সময়ের শুরু হয়। ১৯৯৮-২০০২ সাল পর্যন্ত রিয়াল মাদ্রিদ মোট ৮টি ট্রফি জয় করে। যার মধ্যে রয়েছে ৩টি চ্যাম্পিয়ন্স লীগ। এই সময়ে রিয়াল মাদ্রিদের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো ‘ফিফা দ্যা বেস্ট ক্লাব অব দ্যা সেঞ্চুরি’ ট্রফি জেতা। এই ট্রফি রিয়াল মাদ্রিদকে পরিপূর্ণতা দান করে। রাজকীয় মাদ্রিদকে বসায় সম্মানের সর্বোচ্চ আসনে।

২০০৩-২০১৩ সাল। এগারো বছর। এই সময়ে আবারো পতনের ডাক পায় রিয়াল মাদ্রিদ। দশম চ্যাম্পিয়ন্স লীগের দেখা না পাওয়া রিয়াল মাদ্রিদ এই ১১ বছরে জিতে ৪টি লা-লীগা, ১টি স্প্যানিশ কাপ এবং ৩টি স্প্যানিশ সুপার কাপ। মাত্র ৮টি ট্রফি জেতা রিয়াল মাদ্রিদের কাছে এই এগারোটি বছর এক অন্ধকারাচ্ছন্ন দীর্ঘ রাত ছাড়া কিছুই ছিলো। প্রতিবছরই আশার আলো দেখা রিয়াল মাদ্রিদ বছর শেষে ঢেকেছিলো হতাশার চাদরে। সকলে ভোরের আলোর আশায় জেগেছিলো। কখন পাবে ভোরের দেখা?

অবশেষে ভোরের দেখা পায় রিয়াল মাদ্রিদ। দীর্ঘ এগারো বছরের খরা কাটিয়ে লা-ডেসিমা জয় করে রিয়াল। সেই সাথে আবারো আলোর পথে যাত্রা শুরু করে রিয়াল মাদ্রিদ। ২০১৪-১৮ পর্যন্ত সময়টা হাওয়ার উপর চড়ে উড়ে বেড়ায় রিয়াল মাদ্রিদ। এই পাঁচ বছরে ৪টি চ্যাম্পিয়ন্স লীগ জিতে রিয়াল মাদ্রিদ। সেই সাথে ৪টি ক্লাব বিশ্বকাপ, ৩টি ইউরোপিয়ান সুপার কাপ, ১টি স্প্যানিশ কাপ, ২টি স্প্যানিশ সুপার কাপ এবং ১টি লা-লীগা জয় করে রিয়াল মাদ্রিদ।

এই সোনালী সময়কে অতীত করে ব্যাকফুটে চলে যায় রিয়াল। ২০১৮-১৯ সিজন কাটায় ট্রফিলেস। ভঙ্গুর এই মাদ্রিদে অন্ধকারের ছায়া দেখা দিয়েছিলো। সবাই রিয়াল মাদ্রিদকে নেক্সট এসি মিলান বানিয়ে দিয়েছিলো। কিন্তু, তারা হয়তো জানে না, এর চেয়ে বহু বছর রিয়ালকে অতীতে ভুগতে হয়েছিলো। তারপর, সেখান থেকে আবার ফিরেও এসেছিলো রিয়াল মাদ্রিদ। যেটা এবারো হয়েছে। প্রতিবারের ন্যায় এবারো আলোর দেখা পেয়েছে রিয়াল মাদ্রিদ।

ট্রফিলেস সিজনের দুঃখ ঘুচিয়ে সিজনের শুরুতেই জেতে স্প্যানিশ সুপার কাপ। সেই সাথে জিতে নিলো লা-লীগা। কে বলবে, গত সিজনেই এই রিয়াল মাদ্রিদ ট্রফিলেস সিজন কাটিয়েছে? রিয়াল মাদ্রিদের বর্তমান পারফর্ম কখনোই তা মনে করায় না। রিয়াল মাদ্রিদ ঘুরে দাঁড়িয়েছে। রিয়াল মাদ্রিদ আলোর দেখা পেয়েছে আবারো। আবারো শিরোপায় চুমু খেয়েছে রিয়াল মাদ্রিদ। হ্যাটার্সদের মুখে তালা লাগিয়ে ৩৪তম লা-লীগা জিতেছে রিয়াল মাদ্রিদ। সমৃদ্ধ ঐ ট্রফি কেবিনেটে যোগ হয়েছে আরো একটি ট্রফি। আজ আবারো মাদ্রিদিস্তারা মেতে উঠেছে উৎসবে। শিরোপাহীন বছর রিয়াল মাদ্রিদের সাথে যায় না। রিয়াল মাদ্রিদতো শিরোপা জয়ের জন্যই তৈরি।

এই মাদ্রিদকেই গতবছর সবাই মিস করেছিলো। আজ আরো একবার আলোর পথে পা বাড়ালো রিয়াল মাদ্রিদ।

Related posts

Leave a Comment